রূদ্ধ দিনের প্রাপ্তি

—ও মনুর মা, খানিকটা ডাল হবে গো? ঝন্টুটা দুদিন ধরে খিচুড়ি খেতে চাইছে।—ওর শরীলটা এখনো সারেনি কো?—আজ পাঁচ দিন পর জ্বর আর আসেনি। খুব দুব্বল হয়ে গেছে। ইস্কুলে গেলে ভাত তরকারি বা খিচুড়ি যা হোক পেতো। ডাক্তার-ওষুধ করে ট্যাকাও সব শেষ। লোকটাও দুদিন জল ঝড়ে কাজে যেতে পারে নাই। ঘরে সব বাড়ন্ত। একবাটি চাল আছে। একটু ডাল হলে খিচুড়ি করতাম। হবে তোমার কাছে?— কি আর বলব ঝন্টুর মা আমার ও একই অবস্থা। জল বৃষ্টিতে কিছু আনতে যেতে পারেনি।টালির চাল ফেটে ঘরে জল পড়ছে। আমি ঘরে যা ছিল রান্না বসিয়েছি।—আচ্ছা, দেখি আর কারোর কাছে পাই কিনা।—ঝন্টুর বাবা পার্টির মিচিলে গেলে তো কয়েকশ টাকা পেত। গেলো না কেনো গো? এই সময়ে ভোটের বাজারে আমাদেরও দুটো বেশি রোজগার হয়।—দুবচর আগে বিরোধী পার্টি নিয়ে গিয়েছিল। অনেক ট্যাকা দেবে বলেছিল। কিন্তু পুলিশের লাঠিপেটা খেয়ে পা ভেঙে দুমাস শয্যাশায়ী হয়ে গেল। পারটির লোক ট্যাকা দিয়েছিল কিন্তু সেটা কদিন চলবে। ডাক্তার ওষুধ করে পয়সা শেষ হয়ে গেল। পারটি কোনো খবরও নেয়নি।দুমাস চেয়েচিন্তে কিভাবে সংসার চালিয়েছি সে আমার ঈশ্বর জানেন। সেই থেকে পিতিজ্ঞে করেছে, কোনো পারটির মিছিলে যাবে না।—ঠাকুরপো তো বোকা লোক তাই বিরোধী করতে গেছে। সরকারের পারটি করলে পুলিশের লাঠিপেটা খেতো না। আমরা গরীব মানুষ দিন-আনি, দিন-খাই, ভালো দল মন্দ দল জেনে আমাদের কি হবে? যেদিকে হাওয়া বইবে, যে দল আমাদের সুবিধে দেবে আমরা তার সাথেই থাকবো। তুই ঠাকুরপোকে বোঝাস বুঝলি? এখন বাড়ি যা আর কোতাও যেতে হবে না। অসুস্থ ছেলেটা একা আছে।
২।
—মা তুমি কোতা গেছিলে কত ডাকলাম।—এই তো বাবা, একটু মনুর মার কাছে গেছিলাম। তোর বাবা আজ কাজে বেড়িয়েছে। ওবেলা খিচুড়ি করে দেবো খন।—না মা, ও আমি এমনি বলেছিলাম। তুমি ফ্যানাভাত আর লঙ্কা দিয়ে আলুভাতে দিলেই হবে।এই বৃষ্টিতে বাবা কেনো বেরোলো? যদি আমার মত জ্বর হয়?—না বাবা, আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। জল-ঝড়, অসুক-বিসুক, পুজো-পাবন, কিছুতেই আমাদের দিন পাল্টাবে না। তুই শুয়ে থাক, আমি ভাতটা চাপিয়ে দি।—ও ঝন্টু বাবা, এখন কেমন আছো?
মনুর মা একবাটি খিচুড়ি নিয়ে ঢুকলো।
যেনো আজ এই অসময়ের অঝোর বৃষ্টি থেমে গিয়ে অপ্রত্যাশিত রোদ ঝলমলিয়ে উঠলো।



