পথে যেতে যেতে

ঋষি তার জীবনের শেষ বারোটা ঘণ্টা বোধহয় ভুলতে পারবে না কখনো। কি কি না হল – আর কি কি না হলে কত ভাল হত! সামনে থেকে, পিছন থেকে কতবার তাকে লোকে ধাক্কা দিয়েছে, সে ধাক্কা ঋষি সহ্য করে নিয়েছে। কিন্তু আজকের ঘটনা? না, মুশকিল তার পক্ষে। হ্যান্ডল করা মুশকিল।
১২ ঘণ্টা আগে…
ঋষির একটা শার্টই ভাল লাগে এই ধরনের পার্টিতে পরার জন্য। একটু অফ হোয়াইট কালারের, ফুল স্লিভ। ওকে মানায় ভাল। সকালে উঠে চান সেরে, মাকে ফোন করে সেজে-গুজে তৈরি। আয়নায় একটু দেখে নিল নিজেকে। শার্প লাগছে। শার্টটা সত্যি ভাল। ঋষি বড় একলা মানুষ, বন্ধুবান্ধব বিশেষ নেই এই বড় শহরে, তাই নিজেকে নিজের চোখে দেখতেই ভালবাসে।
এক বছর হল তার এই নতুন কাজে। কলেজের অন্যতম ব্রাইট ছাত্র ছিল, কিন্তু চাকরি ক্ষেত্রে এসে বিশেষ কিছু করতে পারেনি এখনও অবধি। কলেজ শেষে ক্যাম্পাস থেকে চাকরি পায়নি, পরীক্ষা দিয়ে বেশ কষ্ট করে একটা ছোট কোম্পানিতে জয়েন করে। তারপর বছর দুয়েক ওখানেই ছিল। ছোট কোম্পানি, ভাবনা চিন্তাও ছোট – ঋষি ওদের সফটওয়ার ডেলিভারি মডেল চেঞ্জ করতে বলে বসে! কে শুনবে ওর কথা! কোম্পানি ব্যস্ত প্রফিট কবে হবে সেই নিয়ে। ক্লায়েন্ট কীভাবে খুশি হবে তাই নিয়ে। বিজনেস কীভাবে বাড়বে সে নিয়ে।
ঋষি তার থিয়োরি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলেও কোম্পানির বস-দের পছন্দ হয়নি। ওকে সবাই একটু এড়িয়ে চলতে আরম্ভ করল। কাজ যদিও ভালোই করত, যা যা টাস্ক পেত সব সময়ে শেষ করত। কিন্তু……একদিন দুম করে মিটিঙে বলে বসল, এই কোম্পানির কোন ভবিষ্যৎ নেই! তারপর যা হয়। বড় জায়গা হলে এইচ আর ডেকে পাঠাত, হয়ত ওর কথা শুনত। এখানে সে সব কে করবে? ওকে জানিয়ে দিল, ওর জায়গায় অন্য কাউকে ভাবা হচ্ছে, ওকে অন্য প্রোজেক্টে ডেপুটেশানে পাঠাবে এই সব।
এরপর কিছুদিন অন্য একটা জায়গায় ছিল। সেখানেও টিকতে পারেনি। ছোট শহরের মানসিকতা। একটুতে রেগে যাওয়া। উচ্চ-নিচ ভেদাভেদ না বুঝতে পারা। কলকাতা বড় ব্যাপার। একটু আদব কায়দা জানা দরকার। এত বছর রয়েছে, সেই কলেজের দিন থেকে। কিন্তু, এখনও, এই শহরের টেম্পারেমেন্টটা বুঝে উঠতে পারেনি।
এখনকার যে কোম্পানি সেটাতে জয়েন করার মন খুব একটা ছিল না। কিন্তু ঋষির বাবা একপ্রকার জোর দিয়েই ওকে এখানে ঢুকে যেতে বলে। বড় কোম্পানি, মাল্টি-ন্যাশনাল, বাবা খুব একটা সুস্থ নয় – কলকাতা ছেড়ে তখন অন্য কোথাও যাওয়া ঋষির পক্ষে ঠিক হত না। নিমরাজি গররাজি হয়ে কাজে ঢুকেছিল। কিন্তু এখানেও ওই একই অবস্থা। আসলে ঋষি যা করে তাতে বেস্ট হতে চায়। পারে না। হয় না। আর যখন হয় না তখন মেনে নিতে পারে না।
বাবা মারা গেছেন দু মাস হল।
গত সপ্তাহে এক বছর কমপ্লিট করল এই নতুন চাকরিতে। ওকে যা যা করতে বলেছে সে সব করেছে। কিন্তু গোলিয়াথের মত এত বড় কোম্পানিতে ওর সুবিধে করা মুশকিল। তাছাড়া, এই এক বছরে দু বার ম্যানেজার চেঞ্জ হয়েছে। টেস্ট অটোমেশনের ওপর কাজ, স্ক্রিপ্টিং ভাল করতে পারে, কিন্তু……ওর আইডিয়া কেউ নিতে পারে না। তাছাড়া একটু লবি করতে হয়। সাদা বাংলায়, একটু তেল দিতে জানতে হয়। একটা স্পেশাল স্কিল এটা। সব সময়, কেতা দেখালে চলবে কেন? টেকনিকাল ফিল্ডে, বিশেষ করে কোনো improvement নিয়ে কাজ করতে গেলে, একটু সময় দিতে হয়। পরিবর্তন ধীরে ধীরে আসে। ঋষি নিজের মনকে সান্ত্বনা দেয় – আমি সময়ের থেকে এগিয়ে, একদিন ঠিক লোকে আমার কদর বুঝবে।
আজ কোম্পানির ইয়ারলি মিটিং। বস বলেছে তাড়াতাড়ি চলে আসতে। দক্ষিণ কলকাতার একটা বিরাট বড় বিল্ডিঙে হবে মিটিং। ঋষি আগেও ওর পুরনো কোম্পানিতে থাকাকালীন এই ধরনের পার্টিতে গেছে – লাভের লাভ কিছু হয় না। কিছু কথার কচকচানি, আর ভুরি ভোজ। যাই হোক, এবার একটু হলেও ওর ইচ্ছে হয়েছে। হাজার হোক, এক বছর কমপ্লিট করেছে, বিশেষ সমস্যা হয়নি, টিকে থাকতে পেরেছে।
প্রথমে ভাবল বাস আর মেট্রোতে যাবে। তারপর ভাবল, না থাক, রোজ রোজ তো আর যাওয়া হচ্ছে না। কল ট্যাক্সি ডেকে নেওয়াই ভাল। এমনিতে খরচা তো বিশেষ ওর নেই। ঋষির যা খরচা তা জামা কাপড়ে আর একটু আধটু খাওয়া দাওয়ায়। শরীরের প্রতি যত্ন খুব। নিয়ম করে শরীরচর্চা করে। ভাঙ্গাচোরা জীবন, কিন্তু মনে মনে ওর বিশ্বাস – একদিন ঠিক জোরা লাগবে। সেদিন এই শরীর যেন সাথ দেয়।
“কাম ঋষি, কাম, দা টিম ইস ওয়েটিং ফর ইউ।“ বস, মানে সুজিতদার আচরণ একটু অন্যরকম ঠেকল। ওয়েলকাম করল বটে, তবে ঠিক যেন মন থেকে নয়।
“দাদা, লেট নই তো?” ঋষি দুম করে প্রশ্ন করে বসল। কেন যে করল! আগের কোম্পানি হলে করত না। কিন্তু এখানে এলাহি ব্যাপার। সব কিছু বিশাল। তিনটে হল জুরে কনফারেন্স, ডাইনিং, ফুড কোর্ট, ডেমো স্টেশন। ভিতর ভিতর একটা ক্লাস ডিফারেন্স বুঝতে অসুবিধে হয় না। আর ঋষি পছন্দও করে। একটু আলাদা করে নিজেকে ভাবা। অনেক ভাল পড়াশুনোয় ছিল। কলেজে সবাই ওকে সমীহ করে চলত। অন্তত পাঁচজনের ফাইনাল ইয়ার প্রজেক্ট ওই ঠিক করে দিয়েছে – মানে, সাবজেক্ট। আর আজ? কোথায় কোথায় চলে গেছে তার সহপাঠী বন্ধুরা! কিছুটা নিজের আঁতেল ভাবনা আর কিছুটা নির্বুদ্ধিতার জন্যই আজ সে সাইড-লাইনে চলে গেছে।
কিন্তু আর নয়। এবার ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। করবেই কিছু একটা। সোমবার অফিস জয়েন করেই নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করবে। এক্সট্রা সময় বার করবে, টুল বানাবে, সব হয়ে গেলে সুজিতদার কাছে গিয়ে জানাবে। আর একদম ঠাণ্ডা মাথা রাখবে। বিচলিত একদম হবে না।
ঋষি দৌড়ে গিয়ে বাকি কলিগদের সাথে দেখা করল। মেন হলে ঢোকার রাস্তায় আরও যাদের সাথে দেখা হল সবাইকে হাসি মুখে গ্রিট করল।
অনুভব ওর সাথে একই টিমে কাজ করে – বলল, “ঋষিদা, দারুণ লাগছে তোমাকে।“
অন্যদিন হলে পাত্তাও দিত না, আজ অবশ্য শুনে বেশ ভাল লাগল।
টিমের বাকিরা আর সুজিতদা মেন হলেই ছিল, ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। সবাই মিলে ঠিক করল পাশের হলটায় গিয়ে বসবে। ওখানে টপ ম্যানেজমেন্টের কয়েকটা স্পিচ আছে, শুনবে। বাঁদিকের হলে খাবারের ব্যবস্থা আর ওপরে আরেকটা বিশাল হলে অনেকগুলো বুথ বানানো হয়েছে – ফার্ম যে যে প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করছে, তার ছোট ডেমো দেওয়া হচ্ছে।
ঋষি অনুভবের পাশের চেয়ারে বসল। একটু দূরে কফির ব্যবস্থা ছিল, অনুভব নিজের জন্য আর ঋষির জন্য এক কাপ করে নিয়ে এল। ভালবাসে ছেলেটা ওকে। ফলো করে। ওর থেকে অনেক কিছু জানার আর শেখার চেষ্টা করে। কিন্তু ঋষি কিছুতে ওপেন আপ করতে পারে না। ওর থেকে চার বছরের জুনিয়র – কিন্তু কম্পিটিটর মনে করে।
আজ অবশ্য ঋষির মন ভাল, অনুভবের সাথে কথা বলতে, মানে অনুভবকে পাত্তা দিতে ইচ্ছে করছে।
দুজনে তিন বা চার চুমুক দিয়েছে চায়ে, হঠাৎ ঋষির চোখ পড়ল পাশের গ্রুপে। ওদের মত আরও একটা টিম গ্রুপ করে চেয়ার নিয়ে বসেছিল। চোখ পড়ল একজনের অপরেই।
খুব চেনা চেনা লাগছে।
অনুভব কি একটা বলতে যাচ্ছিল, ঋষি থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ওই গ্রুপটা কোন টিমের জানো?”
“না দাদা, তবে মনে হয় এইচ আর।“
“ওই মেয়েটিকে আমি চিনি, ওই যে দেখছো একটু শর্ট হাইট, চোখে চশমা, ফেয়ার কমপ্লেকশান, ওই, ওই মেয়েটা আমাদের ক্লাসমেট ছিল, কলেজে।“
“দাদা……ঠিক দেখছো তো? হাই ফাই ব্যাপার কিন্তু। দেখে মনে হচ্ছে, নতুন জয়েন করেছে। বসের সাথে কথা বলার ধরন দেখে কিছুটা আঁচ করা যায়।“
“ও ঋদ্ধি। আমার বন্ধু।“ এই বলে কিছুটা উদ্ভ্রান্তের মত ঋষি মেয়েটির কাছে দ্রুতবেগে পৌঁছে গেল।
সমস্যা হল, ভারতীয় ওয়ার্ক কালচারে লেভেল মেন্টেন করা খুব জরুরি। এরকম দুম করে পজিশনের তোয়াক্কা না করে কাউকে মিট বা গ্রিট করা সবাই ভালো চোখে দেখে না।
“ঋদ্ধি আমাকে চিনতে পারছিস?” – ঋষি নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে আসলে। খোলসের ভিতর ছিল, মনের দুয়ার নিজেই বন্ধ রেখেছিল, মনের গভীরে যে রঙগুলি আছে সেগুলির ওপর আলকাতরা মাখিয়ে কালো করে দিয়েছিল। ঋদ্ধি যেন ধূমকেতুর মত এসে গেল তার জীবনে! আবার একটা সুযোগ নিয়ে। নিজেকে মেলে ধরবে, রঙ্গিন করে তুলবে ঋষি। ফিরে যাবে সেই দিনগুলোতে।
ঋষি-ঋদ্ধি – নামের মিল আর জীবনেও মিল – এইতো ঠিক ছিল। এইতো হবার ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং ক্লাসে প্রথম আলাপ। দক্ষিণ কলকাতা আর মফঃস্বলের আলাপ। একদিকে অনেক কথা, আরেকদিকে অনেক সাইলেন্স। প্রথমদিন ঋষি অনুধাবন করতেই পারেনি যে এত সুন্দরি কেউ হতে পারে। মানে, মাধুরী, জুহি, কাজল – এসব সিনেমার পর্দায় ঠিক আছে। কিন্তু রিয়েল লাইফে। এতকাল বয়েজ স্কুলে পড়েছে, তাও নিতান্তই সাদামাটা একটা জেলার স্কুলে। স্কুল পালিয়ে সিনেমা একবার দুবার দেখেছে। বাড়ির আশেপাশে বা পাড়ায় তার সমবয়সী মেয়ে কেউ ছিল না। আর বন্ধু হওয়া? সে তো শুধু স্বপ্নে।
ঋদ্ধির কিন্তু ঋষিকে পছন্দ হয়ে যায়। কোথাও একটা সহজ, সরল সৌন্দর্য ঋষির মধ্যে দেখতে পেত। ঋদ্ধির ভালো লাগত। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হল। একসাথে ক্যান্টিনে লাঞ্চ করা, ল্যাবে এক গ্রুপে থাকা, ক্লাসে পাশে বসা – এইসব নিয়ে খুব ভালো কাটছিল দিনগুলো।
“হ্যাঁ, মানে আমি ভালোই আছি, তুই কেমন আছিস?” অনেকদিন পরে, তা প্রায় ৬ বছর পরে দেখা হয়েছে, ঋদ্ধি ঠিক কীভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করবে প্রথমটা বুঝতে পারল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে গুছিয়ে নিল, কর্পোরেট মেন্টালিটিতে মিশে গেছে। সব প্রশ্নের জবাব ও জানে, সব ধরনের সিচুয়েশানে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। অসম্ভব দক্ষতা অর্জন করেছে এই কয়েক বছরে।
“এক্সকিউস মি, আই উইল বি ব্যাক সুন।“ এই বলে ঋদ্ধি ওর টিমের কাছে একটু সময় চেয়ে নিল। ঋষি পাসেই ছিল, এগিয়ে এসে বলল, “চল, ওই পাশের রুমটায় গিয়ে কথা বলি।“
স্লিভলেস টপ আর স্কার্ট, হাতে একটা ব্লেজার। ঋষি কথা বলবে কি? কিছু মুহূর্ত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মনে পরে গেল, সেই পিপিং রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া এক সাথে – বড়দিনের কয়েকদিন আগে হবে। প্রথমবার সেজুয়ান, চপ্সি এদের সাথে আলাপ। ঋদ্ধি কত কিছু শিখিয়েছিল ঋষিকে! ঠিক করে টাই পড়া, কোন ব্লেজারের সাথে কোন ট্রাউজার ঠিক যাবে ইত্যাদি। বারবার কাছে আসত, আর ঋষি ওকে অনুভব করত। অদ্ভুত একটা পারফিউম লাগাত ঋদ্ধি, আর চোখ মুখ সব সময় গ্লো করত। তবে সে ছিল ট্রেলার। এখন যেন সে পরিপূর্ণা। সেন্ট এখনও লাগায়, কিন্তু আরও অনেক দামি, বোঝাই যায় আজ সে সেটল্ড।
“কাপুচিনো নিবি?” ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল।
“আগে হলে তো জিজ্ঞেস করতিস না, শুধু বলতিস, কাপুচিনোটা নে।“ ঋষি মুচকি হেসে বলল। এইভাবে সরল স্বগতোক্তি ঋদ্ধি পছন্দ করত, আর তাই……।
“আমি তো জানি না আজকাল তোর পছন্দ ঠিক কি রকম, তাই জানতে চাইলাম।“
“বেসিক পছন্দগুলো বদলায়নি, বুঝলি? তবে, লাক্সারি করবার চান্স আর নেই। ইচ্ছেও হয় না।“
ঋদ্ধি একটু মাথা নামিয়ে দু গ্লাস কফি তৈরি করে একটা ঋষির হাতে দিল। ঋদ্ধি কম কথা বলে আজকাল। একটা জগতে থাকে, তিন চার জন টিমে আছে, তাদের সাথেই ওর দিন কেটে যায়। অনেক দূর চলে গেছে ভাসতে ভাসতে। কি পায়নি তা আর খুব জরুরি প্রশ্ন নয়, কি পেয়েছে সেটা বেশী জরুরি। আর তার চেয়েও জরুরি – যেটা পেয়েছে সেটাকে কীভাবে ধরে রাখতে পারবে।
“মিস করিস আমাকে?” ঋষি থাকতে না পেরে বলল।
ঋদ্ধি মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর ঋষির দিকে তাকাল। ডান হাত দিয়ে চুলের লক্সগুলো সরিয়ে দিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু বলল না।
“তোর কথা বল, কেমন চলছে কাজ?” একটু হলেও ঋদ্ধি ভিতর ভিতর নরম হয়ে গেছে। নারী চরিত্রের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে পর্যবেক্ষণ। অসম্ভব ক্ষমতা বা প্রতিভা নিয়েই তারা জন্মায়। ঋষির চোখদুটো বলে দেয় সে ভালো নেই।
“হম, আমি যদি বলি, চলছে একরকম, আর তুই যদি সেটা মেনে নিস, তাহলে আমাদের বন্ধুত্বকে অপমান করা হয়। ইট উড বি আ লাই উই একসেপ্ট। তাই বলি, আমি ভালো নেই রে। আমি তোকে মিস করি। রোজ। সকাল, বিকেল। রোজ।“
ঋদ্ধি খুব ধীরে একটু নিঃশ্বাস নিল। ঋষির অচেনা নয়। ওরা যখন কলেজে পড়ত অনেকবার ফিউচার নিয়ে আলোচনা করত। আর তখন কথোপকথনের মধ্যে কখনো কখনো এরকম পজ মোমেন্ট এসে যেত।
“এই দুনিয়ায় কিছু মানুষ থাকে যারা আনন্দ কাকে বলে জানে না। দুঃখ নিয়ে থাকতে চায়। তুই ওই দলের। ঋষি, আনন্দ কনফিডেন্স বাড়ায়। ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ায়। আনন্দ ছাড়া জীবন হয় না।“
“আবার শুরু করলি?”
“কেন করবো না? তোকে আমি কি বলেছিলাম। তোকে বলেছিলাম, কাকু কাকিমাকে কলকাতায় নিয়ে আয়। কলকাতাকে বেস কর। গো ফর অন্সাইট। তোর ট্যালেন্ট, পরিশ্রম, সবের মূল্য পাবি। প্লাস, ভালো টাকা রোজগার হবে। বাট, ইউ কুড নেভার টেক বোল্ড স্টেপ।“
“কিন্তু আমি তো মানি মাইন্ডেড ছিলাম না, তুই তো জানতিস। তোর ওই সব কথা শোনার পর তো আরও অ্যাডামেন্ট হয়ে গেলাম। এখানেই থাকব, এখানেই আরও ভালো কাজ করব।“
“আর কাকু-কাকিমা?”
“ওদের এখানে আসার ইচ্ছে কখনো হয়নি।“
“ফালতুমি করিস না। কাকু ভীষণ এঞ্জয় করত কলকাতায় আসতে। কাকিমা আমাকে অনেকবার বলেছে। একদম ডাহা মিথ্যে কথা বললি।“
এর মধ্যে সুজিতদা আর ঋদ্ধির বস মানে অতনু রয় ওদের দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল।
“ঋদ্ধি আওয়ার প্রেজেন্টেশান স্টার্টস সুন। রেডি থেকো।“ অতনু রয়কে দেখে ঋষির পীট সিগারের “লিটল বক্সেস”গানের লোকগুলোর একজন বলে মনে হল। মানে – দে অল লুক দা সেম। ঋষি এইধরনের লোকেদের কোনদিন খুব একটা পাত্তা দিয়ে উঠতে পারেনি। এরা কেন বা কীভাবে এত বড় পজিশনে পৌঁছল, সেটা ওর কাছে মিস্ট্রি। কর্পোরেট সেটআপে যে কত মেহনত করে ওই জায়গায় যাওয়া যায় সেটা অনেকে বুঝলেও ঋদ্ধি কোনদিন বোঝেনি।
“অতনু-দা, আলাপ করে দি, আমার ক্লাসমেট ঋষি। আমাদের ব্যাচের একজন স্টার ছিলো।“ ঋদ্ধি পরিচয় করিয়ে দিল।
“আচ্ছা, নাইস টু মিট ইউ।“ অতনু রয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, সুজিত বাধা দিল।
সুজিত বলল, “অতনু, লেটস মিট আফটার ইওর সেশন।“
বলে ওরা দুজনে চলে গেল।
এর কয়েক ঘণ্টা পরে………
লাঞ্চ-টাইমে সাধারণভাবে ঋষির টিমের বাকিদের সাথে বসা উচিৎ। কিন্তু, আজ ওর মন চাইল না। ঋদ্ধির উপস্থিতি যেন ও উপভোগ করতে চায়।
ঋদ্ধি তার টিমের সাথে বসেছিল, ঋষি ওর টেবিলে গেল।
“হম, শোন, আমি তোদের টেবিলে যাচ্ছি, তুই তোর টিমের সাথেই বোস। ভালো দেখাবে।“ এই বলে ঋদ্ধি ওর টিমের লোকদের থেকে অনুমতি চেয়ে ঋষির সাথে অন্য টেবিলে গিয়ে বসল।
“ঋষি, কেমন লাগছে? তোমার পুরনো বন্ধু আমাদের কোম্পানি জয়েন করলো। ভালো লাগছে?” সুজিতের কথাগুলো কোনরকমে ঢোক গিলে ভিতরে ঢুকিয়ে নিল ঋষি। এক এক সময় মনে হয় কশিয়ে একটা থাপ্পড় মারে, বলবার কি কায়দা! এদিকে জেন্ডার ইকুয়ালিটি নিয়ে বড় বড় কথা! আর অন্যদিকে ইঙ্গিত ছাড়া কথা বলতে পারে না।
“আসলে আমি জানতাম না ঋষি এখানেই আছে, এখানে এসে জানলাম। খুব ভালো লাগছে, অনেকদিনের বন্ধুত্ব। আবার এক সাথে কাজ করতে ভালো লাগবে।“ কোন ইমোশান ছাড়া কথাগুলো বলল ঋদ্ধি। কত সুন্দর পরিস্থিতি সামলাতে পারে। এই একটা কথার পর আর সুজিত, অজিত, মজিদ কারুর সাধ্য হবে আর তির্যক মন্তব্য করতে!
“আমার আবার পুরনো বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বিশেষ নেই। সব এদিক ওদিক চলে গেছে। যে যার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। দেখা হলো কখনো শপিং মলে বা সিনেমা হলে – তখন কথাবার্তা হলো, আবার যে যার সে তার।“ রোস্ট চিকেন খেতে খেতে সুজিত বলল।
“না সুজিতদা, আসলে বন্ধুত্ব ব্যাপারটা কিছুটা ভাগ্যের ব্যাপার। আর কিছুটা নিজের নেচারের ব্যাপার। সহজ করে বলতে গেলে, সবার কপালে বন্ধু জোটে না। তুমি যদি বন্ধুকে তোমার থেকে নিচের লেভেলে দেখো, সে তোমাকে কেন পাত্তা দেবে বলো না? ম্যানেজার তুমি অফিসে, জীবনে তো নয়। উত্তম কুমারের জীবনী যদি কখনো পড়ো, দেখবে কত সাদামাটা ব্যক্তিগত জীবন ছিলো, অথচ অত বড় একজন স্টার। তাছাড়া, সব বন্ধুরাই অন্যরকমের হবে, তোমার মত হবে না। সেটাও তোমাকে বুঝতে হবে। যেটা সবচেয়ে বড় কথা, স্কুল বা কলেজের বন্ধুরা তোমার নিঃস্বার্থ বন্ধু। তারা তোমাকে বন্ধু বানিয়েছিলো যখন তোমার কিছু ছিলো না। তাদের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখতে গেলে তোমাকে তাদের মত হতে হবে, এবং কোন রিটার্নের প্রত্যাশা না রেখে। ব্যাপারটা খুব টাফ, সবাই পারে না।“
ঋদ্ধি চোখদুটো বড় বড় করে অনেকবার ঋষির দিকে তাকিয়েছে, কিন্তু সে এখন বাধ ভাঙ্গা জলের তোড়। কে আটকাবে তাকে! অনুভবও একবার দুবার থামানোর চেষ্টা করেছে, পারেনি।
“তোমার কী মনে হয় ঋষি আমার কোন বন্ধু নেই?” সুজিত ছাড়বে না। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।
“না সে আমি কী করে বলবো বলো। তবে এগুলো কতগুলো ব্যাপার যেগুলো মাথায় রাখা দরকার – তবেই বন্ধুত্ব টেঁকে। এই দেখো না, যেমন একটা টীম লীড করা। এ তো মূলত কমিউনিকেট করা। আর কমিউনিকেট কী করে করবে? খুব সহজ – সকলকে বন্ধু বানিয়ে নাও। সকলের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করে দাও। সবাই সবাইকে ট্রাস্ট করবে, এক সাথে এগিয়ে যাবে, তুমি পথ দেখাবে। হেলদি কম্পিটিশন থাকবে, কিন্তু রেষারেষি থাকবে না। ফ্রেন্ডলি কো-এক্সিস্টেন্স!”
লাঞ্চের পরে কয়েকটা সেমিনার শেষে দিনের আসর শেষ হল।
কয়েক মিনিট পরে……
“কীভাবে যাবি?” ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল ঋষিকে।
“লিফট দিবি?” ঋষি একটুও বদলায়নি। জীবনে ওর নিজের বলতে ওই একটাই – ঋদ্ধি। ওর রিসার্ভ ব্যাঙ্ক। যেখানে টাকা রাখা যায় না, তোলাও যায় না। কিন্তু যে ব্যাঙ্ক ছাড়া দেশ চলে না।
“হম, জাস্ট ওয়েট এ ফিউ মিনিটস, আই উইল বি ব্যাক। অতনুদা কল করছে, কিছু জরুরি কথা আছে মনে হয়।“
“হ্যাঁ, ঠিক আছে।“ সবুজ, পিঙ্ক, ব্লু, ইয়েলো – কত রকমের বাক্স, কিন্তু সবকটা এক রকম দেখতে। পীট সাহেবের এই গান যেন ঋষি কোনদিন ভুলতে পারবে না। লিটল বক্সেস। আর বেরিয়ে আসতে পারে না তার সমাজ-বোধ বা ওয়ার্ল্ড ভিউ থেকে।
ঋষি অপেক্ষা করতে করতে ভাবল, কেন ঋদ্ধিকে ও পেল না জীবনে। সব তো ঠিক ছিল। মনের মিল ছিল, একে অপরকে চোখে হারাত। দুজনে ভালো কেরিয়ার তৈরি করতে সর্বদা সচেষ্ট ছিল। ভালোলাগাগুলো সমান ছিল। যৌবনের উদ্দীপনা ছিল, একে অপরকে অনেকবার আলিঙ্গন করেছে, চুমু খেয়েছে, আদর করেছে। কিন্তু, জানত কোথায় সীমারেখা টানতে হয়। কখনো তা অতিক্রম করেনি। কিন্তু, তাহলে………
আসলে, ঋদ্ধি স্টেবল রিলেশন চেয়েছিল। একথাও বলেছিল, বিয়ে করে ঘর সংসার করবে। কিন্তু, ঋষি বিয়ে করতে তখন রাজী হয়নি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা। অতিরিক্ত মাত্রায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ঋষিকে টপ হতে হবে – সবেতে। কলেজ থেকে বেরিয়ে ওকে বেস্ট কোম্পানিতে জয়েন করতেই হবে। মা বাবা সমাজে মান পায়নি। ও সেটা করে দেখাবে। ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই কি অন্য কাউকে পেয়ে গেছিস? বিয়ের কথা বললেই কথা ঘুরিয়ে দিস কেন? জানিস তো মেয়েদের বায়োলজিক্যাল ক্লক একটু তাড়াতাড়ি চলে। আমি কিন্তু বেশীদিন ওয়েট করতে পারব না।“
“না, না, তোকে ওয়েট করতে হবে না। আমাকে এক বছর সময় দে। আমি একটু লোন-টোন যা আছে মিটিয়ে নি, তারপরেই আমরা সেটল করবো।“
কিন্তু সেই এক বছর আর শেষ হল না। ইতিহাসের সব চেয়ে লম্বা এক বছর হয়ে গেল। এর মাঝে ঋষির এমন জুনুন চেপে গেল যে সে ঋদ্ধির সাথে দেখা করা বন্ধ করে দিল – প্রথম কোম্পানি মনের মত হয়নি তো কি। ও এইখানেই ফুল ফোটাবে। ঋদ্ধি ফোন করত, মেইল করত, ঋষি দেখা করতে চাইত না। কতদিন আর একটা মেয়ে বৃথা আশা নিয়ে বসে থাকবে। ঋদ্ধির বাবা মা ওকে আরও পড়াশুনো করতে বলল। সেইটুকু অবধি ঋষি জানে, তারপর আউট অফ সাইট। বাট নট আউট অফ মাইন্ড।
“চল, গাড়িতে ওঠ।“ ঋদ্ধি নিজেই গাড়ি নিয়ে এন্ট্রান্সের সামনে এসে ঋষিকে উঠে আসতে বলল।
ঋষি বসল ঋদ্ধির পাশে, আর ঋদ্ধির শারীরিক আবেদনে পাগল হয়ে গেল। সেই ঋদ্ধি। আজ কত পরিণত। চোখে সানগ্লাস পড়েছে, আর স্লিভলেস টপটা যেন ওর শরীরের সাথে মিশে গেছে। এই মুহূর্তটা থেমে যাক। এই সময়কালটা চিরকালের মত আটকে থাকুক।
“ঋদ্ধি, গাড়িটা একটু পাশে থামা।“ ঋষি কিছুদূর যাওয়ার পর বলল।
বাধ্য বন্ধুর মত ঋদ্ধি কথা শুনল।
“তোকে চুমু খাব। তোকে ভীষণ মিষ্টি লাগছে।“ ঋষি আজ ঘড়ির কাঁটাকে অনেক বছর পিছিয়ে নিয়ে গেছে। ঋদ্ধিকে জোরে আলিঙ্গন করল। চুমুতে ভরিয়ে দিল, সাধ মিটছে না ওর। ওর দোষ কী! অনেকদিনের পিপাসা।
“হয়েছে? এবার ছাড়।“ প্রায় দশ মিনিটের মাথায় ঋষির ঘোর কাটল।
“এবার চল পার্ক স্ট্রিট যাই, পিপিং আর নেই, অন্য কোথাও বসে ডিনার করি।“
“হম, যেতে পারলে ভালো হত, বাট, অতনুদা অলরেডি বলে রেখেছে। কী করি, যেতেই হবে। অন্য একদিন?” ঋদ্ধি যেন ইস্পাত কঠিন। তার মত মেয়ে এতদূর এগিয়ে গেছে জীবনে এ অবাক করা ব্যাপার।
ঋষি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ভাবল না থাক। লিমিটেশান বলে একে। কর্পোরেট কালচার।
“ঠিক আছে। আমাকে বিধাননগর ট্রেন স্টেশনে ছেড়ে দে।“
ঋদ্ধি কিছুক্ষণের মধ্যে গন্তব্য স্থলে পৌঁছে গাড়িটা একটা জায়গায় পার্ক করল।
“ঋষি, একটা কথা বলার ছিল। তোর কাজে কোম্পানি একদম খুশি নয়। তাছাড়া, ওদের বক্তব্য, তোর অ্যাটিচুড ঠিক নয়। সো, ওরা তোকে ফায়ার করবে ঠিক করেছে! নেক্সট উইকে আমার তোর সাথে কথা বলতে হবে, উই মাস্ট ফাইন্ড এ গুড এক্সিট প্ল্যান ফর ইউ।“
একটা কথা না বলে ঋষি গাড়ি থেকে নেমে গেল। এত বড় অপমান!
ঋদ্ধি একটু অপেক্ষা করল, যদি ঋষি কিছু বলে। কিন্তু ঋদ্ধি এরকম কেস অনেক দেখেছে, মানুষটাকে নিজের সাথে ছেড়ে দেওয়া ভালো। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য। আর ঋদ্ধি ঋষিকে চেনে – ও টাফ ফাইটার।
ঋদ্ধি গাড়িটা ইউ টার্ন করে নিল। একটা বাম্পার জাতীয় কিছু ছিল, গাড়িটা একটু ধাক্কা খেল। ঋদ্ধির দু চোখ দিয়ে জল স্কার্টের ওপর এসে পড়ল। জানতই না কখন কাঁদতে আরম্ভ করেছে। এরকমই হয় ওর সাথে, চিরকাল। কেন যে আবার এল ঋষি ওর জীবনে!
ঋষি হাঁটতে হাঁটতে প্লাটফর্মের দিকে এগচ্ছিল, এমন সময় একটা ফোন এল।
“হ্যাঁ রে, কেমন হল তোর সেমিনার?”
“হ্যাঁ মা, এমনি ঠিক ছিল।”
“শোন, সকালে তুই ফোন করার পরেই একটা ফোন এসেছিলো। কার বলতো? ঋদ্ধির।”
“তাই? ঋদ্ধি কি বললো?”
“বললো, ও তোর কোম্পানি জয়েন করেছে। আজ তোদের দেখা হবে।”
“আর?”
“আর বললো, ও তাড়াতাড়ি একটা অন্য কিছু সাইডে স্টার্ট করতে চায় – ও চায় তুই সেটা জয়েন করিস। আমি বললাম, সে তো খুব ভালো কথা।”
“আর?”
“আর সেরকম কিছু নয়। জিজ্ঞেস করল, আমি কেমন আছি, আমি কলকাতায় এসে থাকতে পারবো কি না?”
“আর?”
“হম, আমি একটা কথা জিজ্ঞেস করলাম।”
“কি?”
“ও বিয়ে করেছে কিনা।”
“কি বলল?”
“বলল, না।”



