মধ্যদিনের প্রাপ্তি

“আপনার কেমন হল ?”
“হয়েছে মোটামুটি, সি-ল্যাংগুয়েজের অপর মেনলি জিজ্ঞেস করেছে, যা জিজ্ঞেস করেছে উত্তর দিয়েছি।”
“দেখবেন, আপনার হয়ে যাবে। আপনাদের মত স্টুডেন্ট, যারা বড় কলেজে পড়াশুনো করে, তাদের হয়ে যায়, অসুবিধে হয় না।” এই পর্যন্ত বলে মেয়েটি মাথা নিচু করে চলে গেল।
সুজয় খুব একটা আশাবাদী ছেলে কোনোদিন নয় – ভালো ঘটনা কিছু চোখের সামনে ঘটে গেলেও ওর মনে হয় তার পেছনে বুঝি কিছু সমস্যা লুকিয়ে আছে। অনেক পোর খেয়ে এতদূর এসেছে। কলেজে একে ওকে ধরে প্রথমে একটা ট্রেনিং। তারপর চাকরির পরীক্ষার খবরাখবর নেওয়া। তারপর প্রথম ক্যাম্পাসিং-এ মুখ থুবড়ে পরা। এর পরেরটাতেও সেই একই অবস্থা। শেষমেশ আজকেরটায় টেকনিক্যালের গন্ডি পেরিয়ে এইচ আর পর্যন্ত পৌঁছনো। অনেক পরিশ্রম হয়েছে। কাল অবধি ভেবেছিল এবার আর সাদা শার্টটা কাচবে না। আর কাচলেও ইস্তিরি করবে না। কি হবে ? বারবার প্রচেষ্টা, বারবার হতাশা! এইচ আরের লোক যখন জিজ্ঞেস করলো, ‘ডু ইউ হ্যাভ এ বাইক? আ মটর-বাইক ?’ সুজয় ঘাবড়ে বলে দিল, ‘নো মাই প্যারেন্টস ডিড নট এলাও মি।’ আসলে খানিকটা আত্মবিশ্বাসের অভাব, আর খানিকটা তাৎক্ষণিক ভীতি, এই নিয়েই সুজয়ের যত সমস্যা।
রেজাল্ট জানাবে আগামী কাল। একদিন অপেক্ষা করতে হবে। অফিসের বাইরে বেরোল। একটু কিছু খেতে হবে। সেই কোন সকালে হাতিবাগানের মোরে একটা চায়ের দোকান থেকে ডিম টোস্ট খেয়ে বেরিয়েছিল। তারপর থেকে আর কিছু খাবার জোটে নি। বিষ্ণু ওকে ডেকেছিল একসাথে লাঞ্চ করতে, কিন্তু সুজয় তখন খুব ব্যস্ত এইচ আর ইন্টারভিউ নিয়ে। আর তাছাড়া বিষ্ণুর দাদা ওই কোম্পানিতেই কাজ করে। ও বিনামূল্যে খেতে পারবে, সে সুযোগ তার নেই। বিষ্ণু টেকনিক্যাল ক্লিয়ার করতে পারেনি, তারপর আর ওর সঙ্গে দেখাও হয়নি। দেখা হলে জিজ্ঞেস করত স্ন্যাক্স কোথায় পাওয়া যায়।
এ গলি, ও গলি ঘুরে ফিরে এল সেই একই স্থানে। অফিসের মেন গেটের ঠিক উল্টো দিকে। ফাস্ট ফুড, প্যাটিস অগ্রাহ্য করে এক ঠোঙা মুরি আর দুটো আলুর চপ কিনে দোকানের একটা চেয়ারে বসল। মনে মনে ভাবতে শুরু করল, চাকরিটা তার কাছে কতো জরুরি। মা বাবাকে সে কথা দিয়েছে, পড়া শেষ করে এক মাসও সে বসে থাকবে না। মা বাবা জানে সে কথা। সে নিজেও জানে। তার পক্ষে রোজগার শুরু করা কতোটা জরুরি। এক-কামরার ভাড়া বাড়িতে সারাজীবন কাটিয়েছে। তার মধ্যে থেকেছে চার-চারজন প্রাণী।
আলুর চপে ভয়ঙ্কর একটা লঙ্কা ছিল। এক কামড়ে নাক কান লাল হয়ে গেল। এরকম আকস্মিক ঘটনা তার জীবনে অনেক ঘটেছে। এই তো সেদিন বাবার ফ্যাক্টরির মালিক বাড়িতে এসে বলে গেলেন, “বিজয়বাবু, আপনাকে আমি একটা ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার করতে চাই।আপনি কি রাজি?” বাবা তো বেশ খুশি হলেন। অনেক পরিশ্রম, অনেক ঘাম ঝরিয়েছেন, শেষ হাসিটুকু হাসতে পারলে মন্দ কি? কিন্তু ভাগ্য সুজয়দের পিছু পিছু বহুবার ধাওয়া করেছে। তারপর ঠিক সময়ে একটা বড় থাপ্পড় মেরে পালিয়ে গেছে। মালিক তিন দিন বাদে মারা গেলেন, তার ছেলে এক মাসের মধ্যে ব্যবসা বিক্রি করে দিল। পুরনো সব কর্মচারীদের এক সপ্তাহের নোটিসে তাড়িয়ে দেওয়া হল। এই নিয়ে সুজয়ের বাবা পাঁচবার কর্মক্ষেত্র থেকে উৎপাটিত হলেন!
সুজয়ের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। পকেটে সাকুল্যে পনেরো টাকা ছিল। একবার ভাবল, বাড়িতে ফোন করে। তারপর ভাবল, না। সরকারি হোস্টেলে ফিরে গিয়ে করবে। মত বদলাল। ফোনের বুথে ঢুকল।
“বাবা, মা কোথায় ?”
“তোর মা তো লক্ষ্মী পুজো নিয়ে ব্যস্ত, হ্যাঁরে ইন্টার্ভিউ কেমন হল?”
“হয়েছে মোটামুটি, আজ লক্ষ্মী পুজো না কি ?”
“হ্যাঁ, খুব ছোট করে করছি, বন্ধ করিনি। এই লক্ষ্মী পুজোটার পরেই তুই জয়েন্টে চান্স পেয়েছিলি, মনে আছে ? তোর মা ঠাকুরকে ডাকতো, ‘ছেলে যেন সরকারি কলেজে ভালো কিছু পেয়ে যায়, আমাদের বেসরকারি কলেজে পড়ানোর মত ক্ষমতা নেই।’ লক্ষ্মী কথা রেখেছিলেন। আজ দ্যাখ, তোর জন্য কারুর কাছে হাত তো পাততে হয় নি ?”
“ঠিক আছে, মায়ের সাথে কাল কথা বলবো, বেশি পয়সা নেই, ফোন রাখলাম। ভালো থেকো।”
“তুইও ভালো থাকিস, দেখবি এটাতেই লেগে যাবে।”
ফোন বুথ থেকে বেড়িয়ে সুজয় ভাবল বাবার কথা, মানুষটা এক বিন্দুও বদলাল না। শুধু এগিয়ে চল’। একটা হারিয়েছে তো কি? আবার একটা আসবে। বোনটার জন্যও মন কেমন করল, কথা বললে ভালো হত। পুজোর দিনে বোনের সাথে বসে খিচুড়ি খেতে খুব ভালোবাসে সুজয়। সে আর এ বছর হল না। টুক টুক করে হাঁটতে শুরু করল মেট্রো ষ্টেশনের দিকে। বিকেলের পড়ন্ত রোদ। মধ্য কলকাতার একটা বৈশিষ্ট্য হল – মেন রোডে যতই গণ্ডগোল চলুক, বাইলেনগুলোতে তার কিছুমাত্র আভাস পাওয়া যায় না। কি কারণে হোক, সুজয় একবার পিছন ফিরে সেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকাল যেখানে সে আজ সারাদিন ছিল। হয়ত ভাবল, ‘একবার দেখে নি। যদি এরা তাকে না নেয়, অন্তত একবার শেষ দেখা সেরে নি।’ হঠাৎ সুজয় দেখল কোম্পানির এইচ আর সাহেবের গাড়িটা বেরোল, তার কাজ আজকের মত শেষ। বেশ বড় বিদেশি গাড়ি, ঝকঝকে তকতকে। এতদূর অবধি সব ঠিক। কিন্তু গাড়ির পিছনের সিটে ও কে ? ও তো বিষ্ণু ? আর ওর পাশে কি ওর দাদা ? সুজয় মুচকি হাসল, সে তার বাবার মত নয়। সে এগোতে চায় না মাঝে মাঝে। সে থেমে যেতে চায় ধাক্কা পেলে। সে বুঝে গেলো, তার নম্বর লাগার আসা ক্ষীণ বললেও বলা ভুল হবে। নেই, একদমই নেই। আর এই হল জীবন। কোন অভিযোগ নয়, শুধু সহ্য। আর একটা একটা সহ্যের সাথে সাথে মনের আশাগুলোকে মেরে ফেলা।
পায়ে পায়ে ফুটপাথে উঠেছিল। মেট্রো ষ্টেশনে প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল। হঠাৎ পিছন থেকে একটা আওয়াজ এলো।
“মার খাবি? ও সারা আর কিসু নাই আমার কাসে।”
“না রে বুড়া, ভাত খাবো’, এনে দে।”
“কোথায় পাবো? ঘর নাই, জামা নাই, রাস্তায় বাস, বুঝিস না?”
“খিদে পায় রে বাপ, অনেক খিদে পায়, মরে যাবো, বুঝবি তখন।”
“চুপ কর, মার খাবি। তোর মা ফিরুক, দেবে খেতে।”
“পারি না রে বুড়া, পেটে ব্যথা লাগে।”
সুজয় আর পারল না। একটা বড় গাড়ির শোরুমের পাশে এক চিলতে একটা হোগলা জমি মত ছিল, ফুটপাথের পিছনে, চায়ের দোকানের আড়ালে। সেখানে একটা ঝুপড়ির ভিতর থেকে আওয়াজ আসছিল। গাড়ির হর্ন, সহস্র মানুষের কলরব, চিৎকার, হাঁকডাক, এসবের মধ্যেও সে যে কি করে শুনতে পেল, কে জানে?
উল্টো পথে হেঁটে পৌঁছল কুটিরে।
“কি হয়েছে? বাচ্চা কাঁদছে খেতে দিচ্ছ না কেন?”
পঙ্গু বাপের ঘর আরও পঙ্গু। বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন। থাক সে কথা। সুজয় ঠিক করল, হেঁটে হাতিবাগান যাবে। পকেটের বাকি বারো টাকা বারো বৎসরের ক্ষুধার্তের হাতে গুঁজে দিল।
আর্তনাদকারী বলল, “বাবু তোর অনেক ভালো হোবে, তুই আমারে বাঁচালি। দু দিন ধরে মা বাড়িতে নাই, এই বুড়া বাপটা কিছু খেতে দেয় না। খেতে যখন দিবি নে, তবে আমারে আনলি কেন? আর আনলি যদি, মরতে বলিস কেন?”
স্থির চিত্তে সুজয় ভাবল – তবে কি আর্তনাদ মাঝে মাঝে দরকার ? আজ সকালে যে মেয়েটি তার সঙ্গে কথা বলে হেরে গিয়ে ফিরে গেল, সে আর্তনাদ কেন করল না ? তার তো চাকরিটা খুব দরকার ছিল? তার বাবা কোনোদিন কেন আর্তনাদ করেন নি? তারও তো একটা পাকা ঘরের খুব প্রয়োজন ছিল? আর সে নিজে? সে নিজে কেন ছুটে গিয়ে সেই বিদেশি গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল না? মেরিটের কি কোন দামই নেই? প্রশ্নগুলো মাঝে মাঝেই আসবে, সুজয় জানত। কিন্তু আর্তনাদ আর প্রাপ্তি মাঝে মাঝেই আসবে না – এমন আরও একটা মধ্যদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে!



