কলকাতার বাবু পাঁচালী

“বাবু” কথাটির ব্যুৎপত্তির সঠিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলেও, “বাবু” কথাটি বাঙালি জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে আছে। পলাশীর যুদ্ধে (১৭৫৭) জয়লাভের সঙ্গেই বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয়; সাহেবরা “কলিকাতা”কে তাদের প্রশাসনিক কাজের সদর হিসেবে স্থাপন করে। ক্রমে কলিকাতা হয়ে ওঠে বাংলা তথা ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের পীঠস্থান। রাজধানী কলিকাতা শহরের খ্যাতি ক্রমশ এমন আকার নিল যে তার নামকরণ হল “Second city of the British empire”। ইংরেজ শাসনের প্রভাবে কলকাতা শহরের রোশনাই বাড়ার সাথে সাথে শহরের এক শ্রেণীর লোকেদের ইংরেজপ্রীতিও বেড়ে চলল। তারা বুঝলো যে, ইংরেজদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারলে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক- সব ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে। এই তাল মেলানোটা একপ্রকার অনুকরণে রূপান্তরিত হল। সাহেবদের আদবকায়দা রপ্ত করা শুরু হল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাহেবদের নিমন্ত্রণ করা ও তাদের আমোদের ব্যবস্থা করা প্রধান হয়ে দাঁড়ালো। এইভাবে এই বাংলাতে একটা শ্রেণী তৈরি হল যারা মূলত কলকাতার বাসিন্দা; এই শ্রেণীই সময়ের সঙ্গে “বাবু” বলে পরিচিত হতে থাকল। সাহেবদের সঙ্গে এদের ব্যবসা শুরু হল সোনা আর মশলার। ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার পেল সুদূর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও। শেঠ, বসাক, মল্লিক, দত্ত- এরা ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে বাণিজ্য করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করল। দু’ ধরনের ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হল: মশলার ব্যবসা করা গন্ধবণিক ও সোনার ব্যবসা করা সুবর্ণবণিক। অর্থের সাথে স্বভাবতঃই এরা আমদানি করল যথেচ্ছাচার ও শৃঙ্খলহীনতা। এদের ভোগবিলাস এমন মাত্রায় পৌঁছল যে আজকের দিনেও তা শ্রুতি হয়ে আছে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে “বাবু” শব্দটির একটি জাতিবাচক তাৎপর্য তৈরি হল; তা বোঝাতে লাগলো এমন একদল মানুষকে যারা ইংরেজদের অন্ধভাবে অনুসরণ করে সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসে উত্তোলিত হতে চাইল। ইংরেজ উপনিবেশিক শাসনের প্রথম দিক থেকেই কিছু নাম আমরা পাই যারা পারিবারিকভাবে বাবু হয়ে উঠলো। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: শোভাবাজার রাজবাড়ির দেব-পরিবার, হাটখোলার দত্ত-পরিবার, কুমারটুলির মিত্ররা, কাশিমবাজারের নন্দীরা ও পাথুরিয়াঘাটের ঠাকুর-পরিবার। বাবুয়ানির বহর এমন ছিল যে বলা হত মা দূর্গা শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে কাপড় ছাড়েন, কারণ শিবকৃষ্ণ দাঁর বাড়িতে প্রতি ঘন্টায় লোকেরা নতুন কাপড় পড়ত; অভয়চরণ মিত্রের বাড়িতে মা দুগ্গা মধ্যাহ্নভোজন করেন কারণ ওনার বাড়িতে জিলিপি হত রথের চাকার মতন, একশো পদের রান্না হতো প্রতিদিন; রাজা নবকৃষ্ণ দেবের বাড়িতে বসে মা দুগ্গা বাঈজি নাচ দেখেন কারণ শোভাবাজার রাজবাড়ীতে সাহেবদের খুশি করার জন্য বাঈজি নাচ আয়োজন করা হত। এর সঙ্গে চলত আকন্ঠ মদ্যপান। সুরা ও সুরের নেশায় মগ্ন হয়ে মধ্যরাতে সাহেব ও বাবুরা বাড়ি ফিরতেন।
প্রথমদিকে শিক্ষিত ধনী পুরুষদের নামের আগে “বাবু” শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। “বাবু” উপাধি প্রথমে নিজে থেকে কারোর ব্যবহার করার অধিকার ছিল না। কিন্তু ইংরেজশাসনে অনেকেই বাবু বনে গেলেন। আস্তে আস্তে পুরনো শিক্ষিত ধনী সম্প্রদায় বিদায় নিল; আবির্ভাব হল এক নব্য ধনী সম্প্রদায়ের। এরাই বনে গেলেন বাবু। তা কেমন ছিলেন এই বাবুরা? কি ছিল তাদের আচার-আচরণ? কেমনই বা ছিল তাদের জীবনযাত্রা? সাধাসিধা জীবনযাত্রার লোক বাবু হতে পারে না। বাবু হতে গেলে কুকুর-বিড়ালের বিয়েতে লাখ টাকা খরচা করতে হয়, চার ঘোড়ার গাড়ি চেপে ভেঁপু বাজিয়ে স্নান করতে যেতে হয়; এছাড়া রক্ষিতা রাখা, আবার তাদের দালানকোঠা তৈরী করে দেওয়া, পায়রা ওড়ানো, শনিবারের রাতে বাঈ-বেশ্যা নিয়ে আসর বসানো – এসবও করতে হয়। শৌখিনতা না থাকলে বাবু হওয়া যায় না। আর কী ছিল এই শৌখিনতা? জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে, বেলফুলের মালা হাতে জড়িয়ে, গিলে-করা ধুতি পাঞ্জাবি পড়ে, বাঈজি বাড়ি গিয়ে দেদার টাকা ওড়ানো। এখানে মনে রাখতে হবে যে বাবুসমাজ ছিল ইংরেজদের সমর্থক এবং তাদের দোসর। এই বাবুদের কাঁধে ভর করেই সাহেবরা বাংলার অর্থনীতির দফারফা করেছিল। এদের জন্যই কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখেছিলেন- “আজব শহর কলকেতা রাঢ়ি বাড়ি জুড়িগাড়ি মিছে কথার কি কেতা!”
“বাবু” শব্দটির সাথে একটা অনুকরণকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা শোনা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর ঠিক মাঝখানে বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ইংরেজদের এই অনুকরণ অনেকের কাছেই ধন্দের কারণ হয়েছিল। বিখ্যাত ইংরেজি ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্স তাঁর বন্ধু কাউন্ট ডি ওরসেকে নাকি বলেছিলেন যে তিনি ইংরেজিতে “Baboo” লিখতে ভয় পান পাছে সেটা “Baboon” হয়ে যায়। এ ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়, কিন্তু যেটা বেরিয়ে আসে তা হল বাবুদের বাঁদরের ন্যায় অনুকরণ করার চেষ্টা। ১৮২৫ সালে ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ব্যঙ্গাত্মক লেখনি “নববাবুবিলাস”-এ এক সদ্য বাবু হয়ে ওঠা মানুষের বর্ণনা মেলে, যে সামান্য কিছু বাংলা শব্দ লিখতে পারে, কিন্তু চায় যে তার বাংলা কথোপকথনে ইংরেজি শব্দ ছড়িয়ে যাক, যেমন “goddammit” বা “rascal”। এই নব্যযুবক বাবুটির পিতা তাকে পাল্কির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, তার পরিধানে দামি পোশাক আর সে হুল্লোড় করে দিন কাটায় তাঁবেদারদের সঙ্গে; তার রাত কাটে বাঈজি বাড়ি বা বেশ্যাপল্লীতে।
কলকাতার সেযুগের বাবুয়ানি নিয়ে বলতে গেলে অবধারিতভাবে বলতে হবে তাদেরকে নিয়ে কিছু কাহিনী যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। মজার ব্যাপার, যদিও এর বেশিরভাগ গল্পগুলোর মধ্যেই জীবনের মূল্যবোধের কোন বার্তা নেই তবুও সেগুলো সাধারণতার থেকে অনেক বেশি চমকপ্রদ ছিল। সেসব গল্প কোনো না কোনোভাবে আমাদের কল্পনাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। তাই আজকের দিনেও কোনো অতিশৌখিন বা কোনো অতিমাত্রার বিলাসবহুল প্রয়াসকে আমরা অনায়াসে বলি “বাবুয়ানি”; আর যে ব্যক্তি তা করে, তার উদ্দেশ্যে বলি- “লোকটা বেশি বাবুগিরি দেখাচ্ছে”। আজকাল সেই যুগের বাবুদের পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
কথিত আছে, প্রদ্যুম্ন মল্লিক প্রত্যেক শনিবার একটি গাড়ি বিক্রি করতেন আর পরের শনিবার দ্বিগুণ দামে গাড়ি কিনতেন। প্রতি রবিবার তার গাড়ি হাওয়া খেতে যেত গঙ্গার ধারে। দুর্গাপুজোর সময় তিনি ক্রিস্টালের দুর্গামূর্তি বিলেত থেকে আনিয়েছিলেন এবং রোলস্ রয়েস গাড়িতে চাপিয়ে সেই দুর্গাঠাকুরের নগরপরিক্রমা করিয়েছিলেন সর্বসাধারনের দর্শনের জন্য। তার চার চাকার ঘোড়ার গাড়ি আসলে ঘোড়াতে টানত না, টানত জেব্রাতে! বাবু সংস্কৃতির আরো এক প্রতিভূ ছাতুবাবু-লাটুবাবু স্নান করা কালীন ঝাড়লন্ঠন ভেঙে ফেলেন কারণ সেই আওয়াজ তাদের স্নানের সময় শ্রুতিমধুর মনে হয়েছিল একবার। আমরা অনেকেই দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাগরাই জুতোতে হিরে লাগানোর কথা জানি। বাবু রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক সে সময় প্রথম চিড়িয়াখানা করেন, মার্বেল প্যালেস তৈরি করেন। একবার কোনো এক কাঁচের ব্যবসায়ী রাজেন্দ্র নাথ মল্লিককে চিনতে না পেরে অপমান করে বসলেন। সেই দোকানদার যে জাহাজের আনা কাঁচ কিনত, রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক পরে সেই জাহাজের সব কাঁচ কিনে, তা রাস্তায় বিছিয়ে ঘোড়াগাড়ি চড়ে বাবুঘাটে স্নান করতে গেছিলেন। সেই সময়কার গণিকাচর্চা তো বাবু সংস্কৃতির অঙ্গ। হঠাৎ কোনো বাঈজি বা গণিকার নাম শহরে ছড়িয়ে পড়লে তার জন্য বাবুদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। একইভাবে ঘোড়ায় টানা গাড়িও বাবু মেজাজের অঙ্গ। বাবুরা নিজেদের মধ্যে পাল্লা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি কিনতেন- চ্যারিয়ট, ফিটন ব্রাউনবেরি ইত্যাদি।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার “বাবু” নামক রচনায় লিখেছেন যে, “যিনি উৎসবার্থে দুর্গাপূজা করিবেন, গৃহিণীর অনুরোধে লক্ষ্মী পূজা করিবেন, উপগৃহিণীর অনুরোধে সরস্বতী পূজা করিবেন তিনিই বাবু”। এই বর্ণনা আমাদের সামনে এমন এক চিত্র তুলে ধরে যা আমাদের এক অন্য সময়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সে এমন এক সময় যখন উল্লাসের কোন সীমা ছিল না, ফুর্তির প্রাণ সত্যিই গড়ের মাঠ ছিল। আর টাকা! টাকার অঙ্কটা গণিতের হিসেবে ধরা হত না। এই বেহিসাবি হবার খেসারত বহু বাবুই দিয়েছেন সর্বস্বান্ত হয়ে; তারা সব দিক থেকেই রিক্ত হয়েছেন আর তার সাথে নিঃস্ব হয়েছে তাদের স্ত্রী ও পরিবার। সত্যি বলতে কি, বাবুরা কখনো পরিবারের কথা ভাবেননি। রাতের পর রাত তারা কাটিয়েছেন বারাঙ্গনাদিগের বাড়িতে; তাদের পিছনে খরচ করতে গিয়ে নিজেদের সংসার বিসর্জন দিয়েছেন। এই বাবু মানসিকতা শহর কলকাতার সামাজিক নীতির বিচ্যুতি ঘটিয়েছিল। এর পরিষ্কার ছবি আমরা দেখতে পাই কালীপ্রসন্ন সিংহের “হুতুম প্যাঁচার নকশা”তে।
তাহলে এই বাবুরা কি শুধুই মদ, নারীসঙ্গ আর লাগামহীন শখ নিয়েই কাটিয়েছেন? তাদের কি তৎকালীন সমাজের উন্নতির দিশায় কোনো অবদানই ছিল না? ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা পাই যে, এই বাবুদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধ্বজা উড়িয়েছেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম যদুলাল মল্লিক, যিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর বাড়িতে গেছেন। আরেকটি উজ্জ্বল নাম মতিলাল শীল যিনি শিক্ষার প্রসারের জন্য অবৈতনিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ নিজে বাবু পরিবারের হয়েও সমাজ সংস্কারক হিসেবে, সাহিত্যিক হিসেবে অমর হয়ে আছেন। আমরা অনেকেই জানি না যে উনি শুধু “মহাভারত” অনুবাদ করেছিলেন তাই নয়, উনি হরিশ মুখার্জির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যখন হরিশ মুখার্জি “দ্য হিন্দু পেট্রিয়ট” কাগজে নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লেখার সুবাদে তাদের চরম রাগের শিকার হন। এমনও বাবু মানুষ ছিলেন যারা বাবুয়ানির অন্য নিদর্শন রেখেছেন, তাদের অর্থ দিয়ে, শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে। এরা শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে সংস্কারে সাহায্য করেছেন। যেমন, বাবু জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও বাবু দুর্গাচরণ লাহা। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বাবা দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভোগবাদ ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রা অবলম্বন না করে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে হেঁটেছেন।
তাই “বাবু’ কথাটির তাৎপর্য্য একমুখী নয়। আমরা আজকের দিনেও এই বাবু অভ্যাসের বাইরে বেরোতে পারিনি। কোথাও যেন বাঙালির মধ্যে বাবু ভাবনা থেকেই গেছে। আমরা বিভিন্ন সময় “বাবু” কথাটি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করে থাকি। কলকাতার ‘বাবুনামা’ এমন এক অধ্যায় যেটা সেই সময়কার সামাজিক পটভূমিকে নানা রঙে রাঙিয়েছে এবং সে রঙের ছটা বোধহয় আমাদের জীবনেও কোথাও-না-কোথাও লেগে আছে। যতই অন্ধকার হোক এই বাবুবাদ, ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা এই অন্ধকারেই সবথেকে বেশি আলোর দ্যুতি দেখেছিল। আমরাও কি আমাদের জীবনে, চেতন-অবচেতন মনে, একটুও বাবু হতে চাই না? আমরা এখনো বুঁদ হয়ে থাকি পুরনো কলকাতার বাবুয়ানির গল্পে আর সেজন্যই বোধহয় কল্পনার দৃষ্টিতে সেই সব ব্যক্তিদের দেখি যারা হাজার টাকার ঝাড়বাতিতে রাতটাকে দিন করত।



