দেখা হল, তোমার আমার

সুইডেন দেশে প্রায় ১৪ বছর কাটালাম। অনেক কিছু শিখেছি, দেখেছি, অনুভব করেছি আর বুঝেছি। বলাই বাহুল্য, আরও কত কিছু জানার, শেখার, উপলব্ধি করার বাকি আছে। এদেশের ভাষার কথাই যদি ধরি। কতটুকুই বা শিখেছি, এখনও তো কতই বাকি! গবেষণা বলছে, খুব কম সংখ্যক মানুষ এই দুনিয়ায় আছে যারা অনেকগুলো ভাষায় সমান দক্ষতার সঙ্গে কথা বলতে পারে। যাই হোক, এখন আমরা ভাষা নিয়ে কথা বলব না। আজকের কথা বলার বিষয় খাওয়া-দাওয়া। সুইডেন দেশের কয়েকটা খাবারের সাথে কীভাবে আমার পরিচয় হল, আর সেই যে “দুজনে দেখা হল” মোমেন্ট, সেটা ঠিক কেমন ছিল?
বেকড স্যামন
এদেশে থাকার সুবাদে আমার একটা দারুণ সুবিধে হয়েছে। মাছ পেতে আর খেতে বিশেষ অসুবিধে হয় না। সামুদ্রিক মাছ এখানে খুবই জনপ্রিয়। অনেক রকমের মাছই এখানে পাওয়া যায়, আর বেশীরভাগ মানুষ মাছ খেতে ভালোবাসে। মোটামুটি সবগুলোই কখনো না কখনো, কোথাও না কোথাও খেয়েছি, আর খেয়ে ভালোও লেগেছে। তবে এই সবগুলোর মধ্যে স্যামন তুলনাহীন। বাংলাদেশে যদি আমরা বলি, “মাছের রাজা পাবদা-ইলিশ”, তবে এদেশে বসে আমাদের বলা উচিত “রাজা থেকে সাধারণ/ সবার প্রিয় স্যামন।“
এই মাছের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ আমাদের অফিস ক্যান্টিনে। সেদিনের মেনুতে ওটা আছে শুনেই প্রেম উথলে পড়ল। কয়েকজনের কাছে শুনেছিলাম খুব সুস্বাদু। জিভে জল, চোখে আনন্দ নিয়ে শরীরের সব শিরা উপশিরাদের একটু শান্ত হতে বলে আমি থালা ভরে স্যামন নিয়ে এলাম। বেকড স্যামন। একটা লম্বা পিস – ভাপানো, চামড়া সমেত। সাথে একটু ক্রিমের সস, একটা লেবুর পিস আর কয়েকটা আলু সেদ্ধ।
তালটা একটু কেটে গিয়েছিল – সত্যি বলছি। কি ভেবেছিলাম আর কি পেলাম! কোথায় সেই পেঁয়াজ-রসুনের রসা, আর কোথায় বা সেই সর্ষে বাটা দিয়ে ঝাল? মাছ আবার এভাবে কেউ খায় নাকি? না, এদেশীয় মাছ রান্না আমাদের রান্নার ধারেকাছে আসবে না। কোনোদিন না। “এক কুচো কাঁচা লঙ্কা তো অন্তত দিয়ে দিতে পারতো?”
কিনে ফেলেছি, আর কি করব? শুরু করলাম খেতে। ছুরি আর কাঁটা চামচ দিয়ে। একটা ছোট পিস সসে একটু ঠেকিয়ে মুখে ঢোকানো-মাত্র এক অনন্য অনুভূতি। ঠিক ইলিশ নয়! তবে ইলিশের মতই খানিকটা স্বাদ আর হাল্কা একটা তৈলাক্ত ভাব। মুখের ভিতরে যেন নতুন কিছু এলো, যা আগে কখনো আসেনি। এরপর বাকিটা কাব্য। বিভিন্ন ছোট অংশে যেন স্বাদের বিস্ফোরণ। চার পাঁচ বার মুখে নেওয়ার পর আর মনেই রইল না বাঙালি কায়দায় কেন রান্না হয়নি।
আলু আর মাছ যে একসাথে এত কাছাকাছি এসে যেতে পারে তা কে জানত? আলুগুলো খুব ভালো করে সেদ্ধ করা। একটু নুন নেওয়া যেতে পারে, না নিলেও চলবে। আর সসটা? ওটা হল অ্যাংকর। ওটা আমাদের কাই, আমাদের প্রিয় তরকারির ঝোল। তবে তফাৎ একটা আছে, আর সেটা বেশ বড় তফাৎ – মাছের সঙ্গে সস কিন্তু আলাদা থাকে। একটু চাখনা দিয়ে খেতে হয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, উত্তর ভারতীয় খাবারে যে ধরনের আচারের ব্যবহার আছে, মেওনেস দিয়ে বানানো সসটা অনেকটা ঐ রকমভাবে ব্যবহার করতে হয়।
লেবুটার কথাও বলা প্রয়োজন। প্রথমে লেবুটা চিপে মাছের গায়ে লাগাইনি। সাহস পাই নি ঠিক। তারপর দেখলাম কয়েকজন করছে। আমিও করলাম। স্বাদের বিস্ফোরণ যেটা চলছিল সেটা আর রংমশাল, বা ফুলঝুরির মধ্যে থেমে থাকল না। বরং, তুবড়ির মত ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল। একদম তাজা লেবুর রস মাছকে একদিকে যেমন আরও নরম করে দিল তেমনি চামড়ার তলায় যে চর্বি ছিল তার সাথে মিশে গেল। মিশে গিয়ে আরও সুস্বাদু করে তুলল। এতক্ষণ শুধু খাবারটা উপভোগ করছিলাম। এখন খাওয়ার যে অভিজ্ঞতা সেটাকে উপভোগ করতে আরম্ভ করলাম। আর যেই আরম্ভ করতে লেগেছি অমনি মাছ শেষ!
”আবার দেখা হবে বন্ধু” – এই বলে বিদায় নিলাম। আরও একটা গানের কলি মনের ভিতর ঘুরেফিরে এলো “আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো।“
আজ এইটুকুই, আবার একদিন আসবো, এ দেশের আরেকটা খাবারের সাথে আমার প্রথম আলাপের গল্প শোনাতে।



